সোমবার । ১৫ই জুন, ২০২৬ । ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩

বাজেটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, ডিসি নিয়োগে ক্ষোভ রুমিন ফারহানার

গেজেট প্রতিবেদন

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনা চলাকালে ব্যাপক সরব ভূমিকা পালন করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। অধিবেশনের এক পর্যায়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে সুযোগ না পেয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জেলা প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে খোদ মন্ত্রীর সামনে ক্ষোভ উগরেও দেন স্বতন্ত্র এই সাংসদ। সেই সঙ্গে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট ও বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর মেধা ও কৌশল নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

সোমবার (১৫ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন চলাকালে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের সম্পূরক বাজেটে, সম্পূরক মঞ্জুরি দাবির ওপর দেওয়া ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই আক্রমণ করেন।

স্পিকার রুমিন ফারহানাকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় নিয়ে কথা বলার আহ্বান জানালে তিনি আকস্মিকভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বক্তব্য শুরু করেন। স্পিকার তাকে থামিয়ে দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন যে এখন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আলোচনার টার্ন চলছে এবং এটি প্রশ্নোত্তর পর্ব নয়। জবাবে রুমিন ফারহানা বলেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে তিনি সামনে পেয়েছেন, পরে আর ওনাকে পাবেন কি না তার নিশ্চয়তা নেই। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রশ্ন জমা দিলেও তা আসে না, সম্পূরক প্রশ্নের জন্য হাত তুললেও সুযোগ মেলে না। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়েই তিনি ছাঁটাই প্রস্তাবের সময়কে কাজে লাগিয়ে মন্ত্রীর কাছ থেকে জবাব চান।

স্পিকার তখন তাকে বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে বলেন, তিনি চাইলে এখনই স্থানীয় সরকার নিয়ে বলতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ হারাবেন। রুমিন ফারহানা এই সুযোগ লুফে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবেই বক্তব্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং নির্ধারিত তিন মিনিটের মধ্যে নিজের দাবি ও ক্ষোভ তুলে ধরেন।

সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে সরাসরি অভিযোগ করেন যে, সম্প্রতি দেশের জেলাগুলোতে যে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিটিই দলীয় বিবেচনায় বা মনোনীত হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ গত ১০ বছর ধরে গণতন্ত্রের জন্য নিরবচ্ছিন্ন লড়াই-সংগ্রাম করেছে, অথচ বর্তমান সরকার গঠনের প্রায় চার মাস পার হয়ে গেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ের শাসন ব্যবস্থা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে প্রতিটি জেলা ডিসিদের অধীনে শাসিত হচ্ছে, যা সরাসরি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে বাজারে নানা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই বিষয়ে মন্ত্রীর কাছ থেকে স্পষ্ট অবস্থান জানতে চান।

এছাড়া অর্থনৈতিক খাতের ওপর আলোকপাত করে রুমিন ফারহানা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে অর্থমন্ত্রী কী করে এই বাজেট বাস্তবায়ন করবেন সেই প্রশ্ন তোলেন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৪৯ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৯.৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। খেলাপি ঋণ মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যার পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মূলধনের পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ২২ শতাংশ থেকে নেমে মাত্র ৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি ২২.২১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া রফতানির হ্রাস এবং আমদানির বৃদ্ধিকে নির্দেশ করে।

শ্বেতপত্রের তথ্য ও গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির বরাত দিয়ে রুমিন ফারহানা আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে গত ১৫ বছরে পাচার হয়ে গেছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ বছরে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। অন্যদিকে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বছরে আট বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বাইরে গেছে। বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দৃশ্যমান ব্যবসা নেই এমন লোকদের ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং পরিবারের হাতে ব্যাংকগুলোকে একটির পর একটি তুলে দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সুদহার ও ডলারের দাম ঠিক করা হয়েছে এবং ডলারের ওপর চাপ কমাতে দাম ধরে রাখা হলেও ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার এই খাত থেকে বিদেশে চলে গেছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, শেয়ার বাজার এবং কর ব্যবস্থাপনা উন্নত না হলে পুরো চাপ গিয়ে পড়বে ব্যাংক খাতের ওপরে। ঘাটতি বাজেট সংস্কৃতির কথা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, এই ঘাটতি পূরণ হয় দেশের ব্যাংক কিংবা বিদেশি ঋণ বা অনুদানের মাধ্যমে। কিন্তু ব্যাংক খাত যেখানে অলরেডি খেলাপি ঋণে জর্জরিত, সেখানে তারা ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের জন্য কোনো ঋণ দেওয়ার অবস্থায় নেই। আইএমএফ সম্প্রতি জানিয়েছে যে, তারা বাংলাদেশে ঋণের চুক্তির পরবর্তী কিস্তিগুলো নতুন সরকারকে আর দেবে না এবং নতুন করে চুক্তি করতে বলছে। ফলে এখন ঋণের জন্য আমাদের চীন বা এরকম কোনো দেশের দিকে তাকাতে হবে।

এডিবি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা আইএমএফ-এর বাইরে গিয়ে যখন কোনো ভিন্ন দেশ থেকে ঋণ নেওয়া হয়, তখন সুদের হার অনেক বেশি থাকে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সেটি পরিশোধেরও একটা চাপ থাকে। এই তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে অর্থমন্ত্রী কী করে এই বাজেট বাস্তবায়ন করবেন এবং পরিচালন ব্যয়ের জন্য চাওয়া বিশাল অঙ্কের টাকা কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে তিনি তীব্র সংশয় প্রকাশ করেন।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন